চিন্তা
মাঝরাতে পানির পিপাসায় ঘুম ভেংগে গেল রফিক সাহেবের। মাঝেমধ্যে এমন হয়। খুব চিন্তায় থাকলে বারে বারে পিপাসা পায় আর ঘুম ভাংগে। গত কয়দিন ধরে খুব চিন্তায় আছেন রফিক সাহেব। চিন্তা উনার মেয়েদের নিয়ে। মেয়ে তিনটাই অনেক রূপসী মাশা আল্লাহ। স্কুলে পড়াকালীন ই একাধিক বিয়ের প্রস্তাব এসেছে মেয়েদের। কিন্তু উনি মেয়েদের পড়ানোর পক্ষে তাই বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়েছেন সব প্রস্তাবই।
গতপরশু বাড়ি থেকে উনার স্ত্রী ফোন করেন। স্ত্রীর কথা
শুনার পর থেকেই টেনশনে উনার ঘুম হারাম। রফিক সাহেব এক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে
সামান্য ক্যাশিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন। যে বেতন পান তা দিয়ে ঢাকা শহরে
স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকা কঠিন। এদিকে তিন মেয়েই পড়াশুনা করে। তাই স্ত্রী
সন্তান কে গ্রামে রেখে একাই ঢাকায় থাকেন উনি। পরশু উনার স্ত্রী বলেন পাশের
গ্রামের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী, উনার বড় মেয়ের বান্ধবী কলেজ থেকে ফেরার পথে
কিছু বখাটে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। সেই সাথে তার পরিবার কেও হুমকি
দেয় যাতে এই নিয়ে তারা কোন নাড়াচাড়া না করে। এই শুনে উনি স্ত্রী মরিয়ম
বেগমকে বলেন তিন মেয়েকেই তাদের চাচার বাসায় পাঠিয়ে দিতে। আপাতত সেখান থেকেই
কলেজ করুক।
রফিক সাহেবের স্ত্রী বারবার চাপ দিচ্ছেন মেয়েদের বিয়ে
দেয়ার জন্য। বড় মেয়ে পড়ে অনার্স ৩য় বর্ষে, মেজ মেয়ে ১ম বর্ষে আর ছোট মেয়ে
এইবার এইচ এস সি দিবে। মেয়েদের পড়ালেখার যাতে ঘাটতি না হয় সেজন্য তিনি কোন
টাকাও জমাননি। এখন মেয়ে বিয়ে দেয়া অনেক খরচের ব্যাপার। হুট করে কেমনে তা
সম্ভব। কিন্তু মেয়েদের নিরাপত্তার দিকটাও তো দেখতে হবে। কি করবেন ভেবে কোন
কূল পাননা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন ফজরের এখনো এক ঘন্টা বাকী। ঘুম ও আসছেনা
তাই অজু করে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে গেলেন। আল্লাহ্র কাছে তিন মেয়ের মংগলের
জন্য হাত তুলে কাঁদলেন।
অফিসে গিয়েও উনার মন শান্ত হয়না, বারবার
হিসাবে ভুল করেন। এক সহকর্মী এসে জিজ্ঞেস করেন কি অবস্থা, উনাকে অন্যরকম
দেখাচ্ছিল। কোনমতে পাশ কাটিয়ে বসকে বলে আধাবেলা ছুটি নিয়ে মেসে ফিরে আসেন।
দুপুরেও কিছু খাননা। সেই মেয়েটির মুখ বারবার চোখে ভেসে উঠে। গতবার বাড়িতে
গেলে মেয়েটি এসে সালাম করে দোয়া চেয়ে নেয়। প্রায় আসত উনার বাড়িতে, মেয়েদের
সাথে গল্প করতে। বাড়ির আরেকটা মেয়েই হয়ে গিয়েছিল সে।
সেই মেয়ের এমন
দুর্ঘটনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না রফিক সাহেব। শুয়ে থাকতে থাকতেই
মাগরিবের আযানের আওয়াজ কানে আসে। উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে যান। নামাজ শেষে
সিজদায় পড়ে অনেক কাঁদেন আল্লাহ্র কাছে। নামাজ থেকে উঠতেই উনার বড় ভাইয়ের
ফোন। ফোনে জানতে পারেন উনাদের এলাকায় এক এনজিও তে ভালো চাকুরী করে এক ছেলে
অনেকদিন থেকেই উনার বড় মেয়ে রুনাকে পছন্দ করে। কিন্তু রুনার পড়াশুনা শেষ
করার অপেক্ষায় ছিল।
এর মধ্যে সেই ছেলে সাকিবের বদলির আদেশ আসে। বদলি নিয়ে
দৌড়াদৌড়ি করতেই এর মাঝে রুনাকে চাচার বাড়ি দিয়ে আসা হয় তার কিছুই জানতে
পারেনা। রুনাকে না দেখে পাশের বাড়ির এক ছেলের কাছে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে
পারে রুনা তার চাচার বাসায়। রুনাকে হারানোর ভয়ে সাকিব ঐদিন তার মা আর বড়
ভাইকে নিয়ে আগে থেকে কোন ঘোষণা না দিয়েই চলে আসে রুনার চাচার বাসায়।
এখন তারা ওর চাচার বাসাতেই আছে, রফিক সাহেব অনুমতি দিলে আজকেই তারা বিয়ে
পড়িয়ে রুনাকে নিয়ে যেতে চায়। সব শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে যান উনি। আল্লাহ্র রহমত
এত তাড়াতাড়ি আসবে উনার উপর উনি ভাবতেও পারেননি। তাড়াতাড়ি উনার বড় ভাইকে
জানিয়ে দেন ছেলে দেখে পছন্দ হলে উনি যেন দেরি না করেন। ফোন রেখেই আবার
নামাজে দাঁড়ান রফিক সাহেব। এবার শুকরিয়া জানাতে। দীর্ঘ নামাজ শেষ করে উঠে
ফোন করে জানতে পারেন উনার বড় সন্তান, বড় আদরের ধন রুনা এখন অন্য বাড়ির বউ।
ওকে নিয়ে যাবার তোড়জোড় চলছে। ফোনের দুই প্রান্তে বাবা মেয়ে অঝোরে চোখের
পানি ফেলেন। কত স্বপ্ন ছিল বড় মেয়েকে ধুমধাম করে বিয়ে দিবেন, সাতদিন ধরে
লাল নীল আলো জ্বলবে, গ্রামের সমস্ত লোক দুইবেলা দাওয়াত খাবে। সব স্বপ্ন
ভেংগে দিয়ে এক কাপড়ে মেয়ে চলে যাচ্ছে পরের বাড়ি। বুকের মধ্যে মেয়ের
সুপাত্রে দেয়ার সুখ যেমন অনুভব করছেন তেমন অনুভব করছেন নিজ হাতে সুপাত্রে
তুলে দিতে না পারার কষ্ট।
মেয়ের বিয়ের খবর শুনে নিশ্চিন্ত মনে রাতে
শুতে যান রফিক সাহেব। শুয়ে শুয়ে ভাবেন মানুষ নামের জানোয়ার গুলা যদি এভাবে
ঘরে ঘরে মেয়েদের ধর্ষণ না করত, যদি অন্যান্য মুসলিম দেশের মত মেয়েদের
সম্মান দিত তাহলে আজ বাবা হিসেবে উনিও উনার স্বপ্নটা সত্যি করতে পারতেন।
ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েন উনি। হঠাৎ করে মাঝরাতে ঘুম ভেংগে যায়, পানি খেয়ে
শুতে গিয়ে মনে হয় গত দুদিন তাহাজ্জুদ পড়ার ফল আল্লাহ্ হাতেনাতে দিয়েছেন।
আজও তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহ্ কে বলি আল্লাহ যাতে দুনিয়া থেকে ধর্ষণ নামক এই
ঘৃণিত কাজ উঠিয়ে নেন।
শুধু রফিক সাহেব না, আজ হাজার হাজার বাবার
মনেই এই আকুতি। নিজের কলিজার টুকরা মেয়েকে ভালোভাবে লেখাপড়া শিখিয়ে
পাত্রস্থ করা প্রতিটা বাবার অধিকার কিন্তু কিছু মানুষ রূপী পশুর জন্য কত কত
বাবা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
###উম্মে রাদিফা###
No comments